শামস শামীম ::
সার পাচ্ছেননা দুর্গম হাওরের বোরো চাষীরা। অনেক ডিলার সার উত্তোলন করে বিএডিসি বাংলাদেশ কৃষি করপোরেশন (সার) ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দুর্নীতিবাজ কিছু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে কালোবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে। গত ডিসেম্বর মাসের বরাদ্দ কৃষকদের মধ্যে বিতরণ না করে আশুগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে চোরাই সার সিন্ডিকেটের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে শাল্লা উপজেলার ডিলারদের বিরুদ্ধে।
এদিকে, জানুয়ারি মাসের বরাদ্দের সব সার প্রায় ২০ দিন ধরে পড়ে আছে ঘাটে। প্রশাসনিক কড়াকড়ির কারণে ডিলার, বিএডিসি ও শ্রমিক সিন্ডিকেট সার উত্তোলন করতে বিলম্ব করছে বলে জানা গেছে। ওই সিন্ডিকেট গুদামে সার উত্তোলন না করে সরাসরি বিভিন্ন ডিলারের নামে নৌকা থেকেই সার তুলে নিয়ে বাইরে বিক্রি করে দেয়ার ঘটনা সরেজমিন দেখা গেছে। কালোবাজারে সার বিক্রির অভিযোগে শাল্লা উপজেলার একাধিক সার ডিলারকে সরকারিভাবে তলব করা হলেও সন্তোষজনক জবাব মিলছেনা।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মওসুমে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫০৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। জেলায় বোরো চাষী পরিবারের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ। জমি প্রস্তুতের সময় এক দফা ও জমিতে ধান লাগানোর পর আরো দুই দফা সার প্রয়োগ করতে হয়। তবে নন হাওরে তিনবার সার প্রয়োগ করেন কৃষক। সুনামগঞ্জ বিএডিসি (সার) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ডিসেম্বর মাসে জেলায় ১৯৫৮ টন টিএসপি, ৪ হাজার ৫৫৫ মে.টন ডিএপি, এমওপি ৩ হাজার ৪৫ মে.টন বরাদ্দ পাওয়া যায়। জানুয়ারি মাসের বরাদ্দ গত ১৫ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ মল্লিকপুরস্থ বিএডিসি গোডাউনের নৌকাঘাটে এসে জমা হয়ে আছে। এই মাসে ১ হাজার ৩৮৫ মে.টন টিএসপি, ২ হাজার ৯৩৮ টন ডিএপি এবং ১ হাজার ৫৪৩ টন এমওপি সার গত ১৫ ডিসেম্বর থেকে ঘাটে পড়ে আছে।
সরেজমিন রবিবার সকালে গিয়ে দেখা যায়, কনভেয়ার বেল্ট লাগিয়ে সার গুদামে না তুলে সরাসরি ট্রাকে তোলা হচ্ছে। ডিলারের ছোট ছোট কয়েকটি নৌকাও এসে লেগেছে ঘাটে। নিয়মানুযায়ী গুদামজাত করে স্টক রেজিস্ট্রারে তুলে তারপর গাড়ি বা নৌকা করে ডিলার সার নেওয়ার কথা। কিন্তু ডিলাররা সরাসরি গাড়ি ও নৌকা করে নিয়ে যাচ্ছেন। ধর্মপাশা, মধ্যনগর, জামালগঞ্জ, শাল্লা, দিরাই, জগন্নাথপুরসহ বিভিন্ন দুর্গম উপজেলার কিছু ডিলার সার উত্তোলন করেই বিএডিসি ও কৃষি বিভাগের সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে কালোবাজারে সার বিক্রি করে দেন এমন অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। এই সার আশুগঞ্জের একটি সিন্ডিকেট কিনে নিচ্ছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, কৃষক পর্যায়ে টিএসপি ১৩৫০ টাকা, ডিএপি ১০৫০ টাকা ও এমওপি ৯৫০ টাকা বিক্রি করার কথা। কিন্তু বাস্তবে এর চেয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে কৃষকদের।
শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ডিসেম্বর মাসের বরাদ্দ নয়ছয় করে উপজেলার রাজ এন্টারপ্রাইজ, এইচ আর ব্রাদার্সসহ কয়েকজন ডিলার। তারা বরাদ্দের সার এলাকায় না নিয়ে বিএডিসি’র গুদামের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও উপজেলা কৃষি অফিসকে ম্যানেজ করে কালোবাজারে বিক্রি করে দেয়। সরেজমিনে গুদাম পরিদর্শন করে তাদেরকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিলে কোনও জবাব দেয়নি। যার ফলে কৃষকদের অধিক দামে বাইরে থেকে সার কিনতে হচ্ছে।
শাল্লা উপজেলার কৃষকদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক একরামুল হোসেন বলেন, শাল্লা শতভাগ বোরো এলাকা। আমাদের কৃষকরা সার সংকটে ভোগছে। আমাদের বরাদ্দের সার সরকারিভাবে দেওয়া হলেও ডিলাররা উত্তোলন করে কালোবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে। এ কারণে আমরা অতিরিক্ত দামে সার কিনছি। শাল্লা উপজেলার বাহাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ চৌধুরী নান্টু বলেন, প্রতিদিন আমাদেরকে সার পাচ্ছেন না বলে কৃষকরা অভিযোগ করছেন। আমাদের শাল্লায় কেন সার আসেনা এবং কৃষকরা কেন সময় মতো সার পাননা এটা প্রশাসনকে খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিতে হবে।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, সার ও বীজের মওসুমে সুনামগঞ্জের কৃষকরা সরকারি সার ও বীজ বেশিরভাগই পাননা। যারা পান তারা অতিরিক্ত দামে কিনেন। আমরা খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি ঘাট থেকেই এই সার নৌকা ও গাড়ি করে কালোবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। এই বিক্রিতে ডিলার, বিএডিসি ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দুর্নীতিবাজ চক্র জড়িত। এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার এসোসিয়েশন সুনামগঞ্জ জেলা সেক্রেটারি শামসুল আলম বলেন, লেবার সংকটের কারণে আমরা সার অনেক সময় সরাসরি নৌকা থেকে নিয়ে যাই। তবে আমরা কালোবাজারিতে বিক্রি করিনা। সুনামগঞ্জ বিএডিসির সহকারী উপপরিচালক (সার) আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, আমরা খাতাপত্র মেন্টেইন করে ডিলারদের বুঝিয়ে দেই। তারপর তারা কি করে তা দেখার দায়িত্ব কৃষি বিভাগের। গুদামজাত না করে সরাসরি ডিলারদের সার দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, শ্রমিক সমস্যার কারণে এটা মাঝে মধ্যে করা হয়। তবে আমরা স্টক রেজিস্ট্রার ও ক্যাশমেমো রেখেই বরাদ্দ দেই। আমরা কোনও অনিয়মে জড়িত নই।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, শাল্লার কয়েকজন ডিলার সরকারি বরাদ্দের মিস ম্যানেজমেন্ট করেছে। আমরা প্রমাণ পেয়ে শোকজ করেছি। তারা সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেনি। তাই তাদের ডিলারশিপ বাতিলের ব্যবস্থা করা হবে। তিনি আসার পর কৃষি বিভাগের কেউ ডিলারের সঙ্গে কোনও অনিয়মে জড়িত হওয়ার সুযোগ নেই বলে জানান তিনি।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
অসাধু ডিলার সিন্ডিকেট সক্রিয়
সরকারি সার বিক্রি হচ্ছে কালোবাজারে
- আপলোড সময় : ০৫-০১-২০২৬ ০৯:২৮:২৯ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৫-০১-২০২৬ ০৯:৫৮:৪১ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক সুনামকণ্ঠ